পদ্মার ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে দেবগ্রাম ইউনিয়ন !

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়ন। গত তিন-চার দিনের অব্যাহত ভাঙনে এ ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি এখন নদীতে। জমি ও বসতভিটা হারিয়ে পদ্মাপাড়ের শত শত পরিববার এখন নিঃস্ব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দু-এক মিনিট পর পরই নদীর পাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ছে নদীতে। ভয়াবহ এই পরিস্থিতি দেখতে নদীপাড়ে ভিড় করেছে শত শত মানুষ। এ সময় কথা হয় ১০নং যদু মাতুব্বারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আকাশ মৃধা ও মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তারা জানান, ২০-২৫ মিনিট আগে এখানে এসেছেন ভাঙন দেখতে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের চোখের সামনে অন্তত একশ’ ফুট জায়গা নদীতে চলে গেছে।

এখানকার মানুষকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসতভিটা থেকে দ্রুত ঘড়বাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। বসতভিটা থেকে চির বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফরিদা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহিণী। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ঘর ভাইঙ্গা নিয়া এক আত্মীয়র বাড়ি রাখতাছি। সেহানে রাইখা দমডা ফালাইয়া হেরপর দেহুম কোনে যাওন যায়। এহানেতো ভাঙনের ডরে দম বন্দ হয়া আসতাছে।’

আর একটু এগোতেই চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি পরিবার তাদের বসতঘর, গরু-ছাগল নিয়ে একটি ট্রলার বোঝাই করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। নারী-পুরুষ-শিশু সবার চোখে পানি। তাদের বিদায় দিতে আসা গ্রামবাসীর চোখেও পানি। এ বিদায় যেন অন্য রকম এক যন্ত্রণার। বছরের পর বছর যাদের সঙ্গে কেটেছে, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সব ছিন্ন করে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা। হয়তো আর কখনও এভাবে দেখা হবে না।

বিদায় নেওয়া পরিবারের সদস্য লালন সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পাগলা নদী আমাগো একসাথে থাকতে দিল না।’ দেবগ্রামের তোরাপ আলী সরদার (৬০), ফুলচাঁদ (৪৫), রিজিয়া বেগম (৩৮), আবুল শেখ (৫০), আফছার সরদারসহ (৬৫) অনেকেই জানান, সপ্তাহখানেক ধরে এ এলাকার নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতি মুহূর্তে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কেউ তাদের খবর নিতে আসেননি। পদ্মার ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলসহ জমি নদীতে বিলীন হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা।

চরদেলুনদী গ্রামের কৃষক আ. ছালাম জানান, তার আট বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। এ সময় তার পাশে থাকা নুর ইসলাম, সোহাগী বেগম, নুরজাহান বিবিসহ অনেকে বলেন, কয়েক দিনে চরবরাট, অন্তার মোড়, দেলুনদী, তেনাপচা, দেবগ্রামসহ নদীপাড়ের জমিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের ফসল নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তারা সর্বস্বান্ত।

দেবগ্রাম ইউনিয়নটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী এবং জেলা প্রশাসকের কাছে ইউপি চেয়ারম্যান আতর আলী সরদারের নেতৃত্বে স্মারকলিপি দিয়েছেন ইউনিয়নবাসী।

ইউপি চেয়ারম্যান আতর আলী সরদার জানান, তার ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৫নং ওয়ার্ডের শত শত পরিবার ভাঙন আতঙ্কে ভিটেমাটি ছাড়ছে। এই কয়েক দিনে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইউনিয়নটি ভাঙনের শিকার হলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি র্কর্তৃপক্ষ। এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে দেবগ্রাম নামের ইউনিয়নটি হারিয়ে যাবে।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসার উদ্দিন বলেন, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন সম্পর্কে ইতিমধ্যে প্রশাসন অবগত হয়েছে। আজ (বুধবার) বিকেলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী ও জেলা প্রশাসক ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তারা ভাঙন প্রতিরোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতায় সম্ভব সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...