স্বামীর পেশা ধরে রেখেছেন রাজবাড়ীর ঝুমু দাস

না, তিনি সাইকেল চালাতে জানতেন না। স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ নয় মাস হেঁটে হেঁটে রাজবাড়ীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে পত্রিকা সরবরাহ করেছেন। কিছু দিন আগে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটি সাইকেল কিনেছেন। চালানো শিখে এখন সেই সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করেন ঝুমু রানী দাস। বিয়ের পর যিনি রাজবাড়ী শহরে যাননি। তাকে আজ শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটতে হচ্ছে জীবন-জীবিকার তাগিদে।

রাজবাড়ী পৌর এলাকার রেল কলোনির বাসিন্দা পত্রিকা এজেন্ট মৃত জীবন দাসের স্ত্রী ঝুমু দাস ধরে রেখেছেন তার স্বামীর পেশাকেই। এ নিয়ে তার বিন্দুমাত্র জড়তা বা কোনো আক্ষেপ নেই। তার স্বামীর পেশাও ছিল পত্রিকা সরবরাহ করা। ঝুমু রানী দাস জানান, ২০০২ সালের ৫ জুন জীবন দাসের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর জীবনকে নিয়ে সুখেই ছিলেন তিনি। তাদের সংসারে আছে ছেলে অরণ্য দাস। এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে সে।

২০১৭ সালে জীবনের কিডনির অসুখ ধরা পড়ে। স্বামীর কিডনির চিকিৎসা করাতে গিয়ে সঞ্চিত সব টাকা ব্যয় হয়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চিকিৎসার জন্য জীবনকে ঢাকায় নেওয়া হয়। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। জীবন অসুস্থ হওয়ার পর ছেলে অরণ্য কিছু দিন পত্রিকা সরবরাহ করত। কিন্তু এতে তার পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটত। ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকাকালে স্বামী জীবন দাসই তাকে এ পেশা ধরে রাখতে বলেছিলেন। নিরুপায় হয়ে অসুস্থ স্বামীকে ঢাকায় হাসপাতালে এক নিকটাত্মীয়কে দেখাশোনার জন্য বলে রাজবাড়ী ফিরে আসেন ঝুমু। তুলে নেন গুরুদায়িত্ব। শুরু করেন পত্রিকা সরবরাহের কাজ। ছেলে অরণ্য তাকে গ্রাহক চিনিয়ে দিতে সাহায্য করে।

প্রথম দিকে মানুষ নানা কটু কথা বলত। কেউ কেউ প্রশংসাও করত। তিনি কখনও কারও কটু কথায় কান দেননি। নিজের কাজ করে চলেছেন। চলতি বছরের ২৫ জুন স্বামী জীবন দাস মারা যান। কিন্তু থেমে থাকেননি ঝুমু দাস। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে সাংসারিক কাজ শেষ করে ছেলের নাশতা তৈরি করে সাড়ে ৫টার দিকে চলে যান পত্রিকা নামাতে। এর পর দিনভর চলে পত্রিকা সরবরাহ। রাজবাড়ী শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত হেঁটে বিলি করেন পত্রিকা। এর মাঝে এক ফাঁকে করে নেন নাশতা। দুপুরে বাড়ি গিয়ে আবারও সাংসারিক কাজ করতে হয়। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে আগস্ট মাসে কেনেন একটি সাইকেল। ছেলে অরণ্যর সাহায্যে রাতের বেলায় শিখতেন সাইকেল চালানো। সাইকেল চালানো শিখতে তার বেশ কিছু দিন সময় লেগেছে। সাইকেল চালানো শেখার পর গত এক মাস ধরে তিনি সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা সরবরাহ করছেন।

ঝুমু দাস বলেন, আমার জমি-জিরেত, সহায়-সম্পত্তি কিছু নেই। রেলের জমিতে থাকি। একমাত্র ছেলে অরণ্যই আমার সম্পদ। তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করাই এখন আমার স্বপ্ন। নিজের সাংসারিক কাজ ছাড়া কখনও কিছু করতে শিখিনি। বাজারেও যাইনি কখনও। জীবন-জীবিকার তাগিদে আমি কাজ করে টাকা উপার্জন করছি। এতে কে কী বলল তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। বরং পত্রিকা বিক্রির মতো মহান কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...