গোয়ালন্দ ঘাটের ‘স্টীমার কারি’র কথা মনে আছে?

ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার আগে পূর্ব বাংলার মানুষকে এই গোয়ালন্দ ঘাট থেকে কোলকাতার ট্রেন ধরতে হতো। আর গোয়ালন্দ পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হতো পদ্মা। সেই গোয়ালন্দ ঘাটের রেস্টুরেন্টে, কিংবা স্টীমারের পাচকদের হাতের রান্না খাওয়ার সুযোগ যাদের হয়েছিল, তাদের মুখে যেন এখনো লেগে আছে সেই রান্নার স্বাদ।

আর স্টীমার ঘাটের খাবার নিয়ে এই স্মৃতিকাতরতা ঘিরে অনলাইনে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই রান্নার রেসিপি।

সোমতপা ব্রহ্মচারী নামে একজন সম্প্রতি অনলাইনে এই ‘গোয়ালন্দ স্টীমার কারি’র রেসিপি প্রকাশ করার পর তা অনেকেই শেয়ার করেছেন ফেসবুকে। তাঁর বাবা-মার আদি নিবাস ছিল এখনকার বাংলাদেশেই। ‘বংকুক ডট কম’ ওয়েবসাইটে এই রেসিপি দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, এই রান্নার গল্প তিনি শুনেছেন তাঁর বাবা-মার কাছেই।

ভোজনরসিক বলে পরিচিত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় এই গোয়ালন্দ চিকেন কারির বর্ণনা আছে।

“ত্রিশ বৎসর পরিচয়ের আমার আর সবই বদলে গিয়েছে, বদলাইনি শুধু ডিসপ্যাচ স্টীমারের দল। এ-জাহাজের ও-জাহাজের ডেকে-কেবিনে কিছু কিছু ফেরফার সব সময়ই ছিল, এখনো আছে, কিন্তু সব কটা জাহাজের গন্ধটি হুবহু একই। কীরকম ভেজা-ভেজা, সোঁদা-সোঁদা যে গন্ধটা আর সবকিছু ছাপিয়ে ওঠে, সেটা মুর্গী-কারি রান্নার। আমার প্রায়ই মনে হয়েছে, সমস্ত জাহাজটাই যেন একটা আস্ত মুর্গী, তার পেটের ভেতরে থেকে যেন তারই কারি রান্না আরম্ভ হয়েছে। এ-গন্ধ তাই চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোয়ালন্দ, যে-কোন স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই পাওয়া যায় । পুরনো দিনের রূপ রস গন্ধ স্পর্শ সবই রয়েছে, শুধু লক্ষ্য করলুম ভিড় আগের চেয়ে কম।”

গোয়ালন্দ স্টীমার কারির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গুঁড়ো মশলা নয়, আস্ত মশলা দিয়েই রান্না হয় এই তরকারি। গতানুগতিক রান্নার সঙ্গে স্বাদের তফাৎটা তৈরি হয় সেখান থেকেই।

সোমতপা ব্রহ্মচারির পোস্ট করা রেসিপির নীচে দেব ভট্টাচার্য নামে একজন লিখেছেন, “ এই রেসিপির গল্প শুনে ঢাকার সদরঘাট থেকে টাঙ্গাইলের কাছে এলাসিন পর্যন্ত স্টীমারে ভ্রমণের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। এসব স্টীমারের চালকদের নিত্যদিনে খাবার ছিল এই কারি। তবে যাত্রীরাও এই খাবার অর্ডার করতে পারতেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই অগাষ্ট রাতে আমি আমার বাবার সঙ্গে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যাচ্ছিলাম। সেদিন পাকিস্তানের স্বাধীনতা উদযাপনের জন্য স্টীমারের সব যাত্রীকে এই চিকেন কারি আর ভাত পরিবেশন করা হয়েছিল। তরকারিটা অনেক সুস্বাদু ছিল, কিন্তু আমার খুব ঝাল লেগেছিল। কারণ তখন আমি ছিলাম খুবই ছোট।”

গোয়ালন্দ ঘাটের খাবার নিয়ে অনেকে এখনো নস্টালজিয়ায় ভোগেন
সোমতপা ব্রহ্মচারীর “গোয়ালন্দ স্টীমার কারি রেসিপি”

যা যা লাগবে:

একটি মাঝারি সাইজের আস্ত মুরগী, হাড়সহ টুকরো করা; চারটি বড় পেঁয়াজ, মোটা করে কুচি করা; ৬/৭টি রসুনের কোঁয়া, কুচি করা ; এক ইঞ্চি আদা, টুকরো করা ; ২/৩টি শুকনো মরিচ, গুঁড়ো করা ; এক টেবল চামচ হলুদ ; ৫/৬ টেবল চামচ সরিষার তেল ; এক চা চামচ চিনি ; লবণ পরিমাণ মত।

প্রণালী:

সব মশলা মুরগীর মাংসের সঙ্গে মাখিয়ে একঘন্টা রেখে দিন।

একটা ভারী হাঁড়িতে মাংস ঢেলে মাঝারি আঁচে রেখে ৫ থেকে ৭ মিনিট নাড়তে থাকুন। এরপর ঢেকে দিন। পানি দেয়ার দরকার নেই। মাংসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পানিই ঝোলের জন্য যথেষ্ট। মাংস যখন নরম হয়ে আসবে, তখন নামিয়ে গরম ধোঁয়া উঠা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...