গোয়ালন্দের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর

জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করে চিনিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে এত দিন বাড়ির পাশের বীর মুক্তিযোদ্ধাকেও চিনত না অনেক শিশু-কিশোর। কিন্তু রাজবাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ জাদুঘর হওয়ার পর দৃশ্যপট পাল্টেছে।

রাজবাড়ীর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ জাদুঘরটিতে রয়েছে রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ উপজেলার ৭২ জন মুক্তিযোদ্ধার ছবিসহ বিস্তারিত পরিচিতি। ফলে সহজেই তাদের চিনতে পারছে নতুন প্রজন্ম। রাস্তাঘাটে দেখা হলে শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে আলাদা সম্মান পাচ্ছেন তারা।

গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের কাশিমা গ্রামে ২০০৯ সালে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করেন ছোটভাকলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা গিয়াস। জাদুঘরটি ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়।

মাত্র আড়াই শতাংশ জমিতে একটি চৌচালা টিনশেডের ঘরে গড়ে তোলা জাদুঘরের দেয়ালে ঠাঁই পেয়েছে রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিসহ পরিচিতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারকসহ ভারতের কল্যাণী ক্যাম্পের কিছু দুর্লভ ছবি, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবি, যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত যুদ্ধের ইতিহাস ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের কপি, যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহূত কিছু উপকরণসহ পাঁচ শতাধিক আলোকচিত্র।

উপজেলার বরাট ভাকলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রিয়াজ আহম্মেদ বলে, আমরা আমাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের চিনেছি এ জাদুঘরে থাকা ছবি দেখে। জানতে পেরেছি কীভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে এ দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এখন আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহজেই চিনতে পারি এবং রাস্তাঘাটে দেখলে সালাম দেই।

নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাতে এ জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে গোয়ালন্দ উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুস সামাদ মোল্লা বলেন, নতুন প্রজন্ম অনেকে জানে না মুক্তিযুদ্ধ কী? এখানে এসে তারা জানতে পারছে দেশের মানুষ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এ জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের চিনে না তাদের সম্পর্কে জানে না, এমন কোনো মানুষ নেই। এ এলাকার সবাই বলতে পারবে ১৯৭১ সালের মরণপণ যুদ্ধের কাহিনী।

জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম মোস্তফা গিয়াস বলেন, ১৯৭৫ সালের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলণ্ঠিত হওয়া শুরু করে। অপশক্তি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নানা তথ্য বিভ্রাট সৃষ্টি করা হচ্ছে। তখন থেকে চিন্তা করি মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে। এ এলাকায় জাদুঘরটি তৈরি হওয়ায় এখন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সহজেই চিনতে পারছে নতুন প্রজন্ম। রাস্তাঘাটে আলাদাভাবে সম্মান করা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের।

তিনি আরো বলেন, একক উদ্যোগে এ জাদুঘরটি তৈরি করেছি। আমার দাবি জাদুঘরটি আরো সম্প্রসারণ হলে এ অঞ্চলের মানুষের মন থেকে কখনো সেই সব দিনের স্মৃতি হারাবে না। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

জাদুঘরটি অত্যন্ত ছোট পরিসরে হলেও প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দেখতে আসছে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রথম থেকেই জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Captcha loading...